জেড ক্যাটাগরির টানা দরপতন, এ দায় কার? কোম্পানি ডিলিষ্ট করলে হলমার্ক বা ডেসটিনির সাথে শেয়ার বাজারের পার্থক্য থাকবে কি?

0
(0)


ডিএসকে কামরুল, ঢাকা ঃ- ডিলিষ্টিং আতংকে দেশের শেয়ার বাজারে জেড ক্যাটাগরির বেশ কয়েকটি কোম্পানির টানা দরপতন চলছে। দরপতনের মাত্রা এতই তীব্র যে, সকাল সাড়ে দশটায় বাজারে ট্রেড শুরু হওয়ার সাথে সাথেই কার আগে কে সেল দিবে এমন প্রতিযোগিতায় দিনশেষে ক্রেতা খোজে পাওয়া যাচ্ছে না এসব জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি গুলোর। হটাৎ এরকম বায়ারলেস পরিস্থিতিতে পড়ে দিশেহারা এক শ্রেণীর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। এমতাবস্থায় পুজি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে বেশকিছু সংখ্যক বিনিয়োগকারীর।

জানা যায়, সম্প্রতি হটাৎ করে রহিমা ফুড ও মডার্ন ডাইং কোম্পানি দুটি ডিএসই থেকে ট্রেড সাসপেন্ড করা হয়। এ দুটি কোম্পানিকে সাসপেন্ড করার পর থেকেই জেড ক্যাটাগরির কয়েকটি শেয়ার বায়ার সংকটে পড়ে দরপতন শুরু হয়। রহিমা ফুড ও মডার্ন ডাইং সাসপেন্ডের আতংক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই লিষ্টিং রেগুলেশনের রুল অনুযায়ী জেড ক্যাটেগরির আরো ১৫ টি কোম্পানির রিভিউ নিউজ ডিএসইর ওয়েব সাইটের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই রিভিউ নিউজ যেনো আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে দরপতনকে আরো দীর্ঘায়িত করেছে। ফলে আজও চিহ্নিত ১৫ টি কোম্পানির দরপতন অব্যাহত আছে। দরপতনের কবলে পড়ে ৭০ টাকার শ্যামপুর সুগার ২৫ টাকা, ৩৫ টাকার মেঘনা পিইটি ১৩ টাকা, ৫৬ টাকার দুলা মিয়া কটন ১৮ টাকা, ৮৫ টাকার ঝিলবাংলা ৩১ টাকা, ৪০ টাকার মেঘনা মিল্ক ১৫ টাকা, ৪৫ টাকার ইমাম বাটন ২০ টাকায় নেমে এসেছে। এইসব শেয়ারে আটকে পড়া বিনিয়োগকারী বর্তমান দরে এসব শেয়ার বিক্রি করলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লোকসান গুনতে হবে। এমতাবস্থায় বিনিয়োগকারীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন ।গত ৫ বছর যাবত ডিভিডেন্ড দেয়না এমন ১৫ টি কোম্পানির বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যত পরিকল্পনা জানতে চেয়ে কোম্পানির পারফরমেন্স রিভিউ চিঠি দেয়া হয়েছে। যেহেতু কোম্পানি গুলো ডিএসইর তালিকাভুক্ত ডিএসই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কোম্পানির সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নিতেই পারে। কিন্তু এই রিভিউ নিউজটিকে পুজি করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার চেস্টায় আছে। অবশ্য জেড শেয়ার লেনদেনে বিরম্বনা আজ নতুন কিছু নয়, বিভিন্ন সিকিউরিটিজ হাউজে ঝুকির অজুহাত দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের জোর করে জেড কেনা থেকে বিরত রাখা হয় বলে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। তবে কি বিনিয়োগকারীদের পুজি নিরাপদ রাখার স্বার্থে জেড ক্যাটাগরি কিনতে বাধা দেয়া হয়? নাকি অন্যকিছু! যদি বিনিয়োগকারীর পুজির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে জেড কিনতে বাধা দেয়া হত তাহলে অন্যান্য ক্যাটাগরির যেসব লো পেইড কোম্পানি ২০ টাকা থেকে হু হু করে ৩০০-৪০০ টাকায় উঠছে, বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তার স্বার্থে ওই কোম্পানি গুলো ৩০০-৪০০ টাকায় কিনতে হাউজ থেকে বাধা দেয়া হত। জেডের বিরোদ্ধে বিভিন্ন হাউজ কর্তৃপক্ষ যত টুকু সোচ্চার লো পেইডের কারসাজি চক্রের ঝুকিপূর্ন কোম্পানি গুলোর প্রতি ততটা সোচ্চার হলে গেম্বলাররা বায়ার সংকটে পড়ে আটকা পড়তো এবং দ্বিতীয়বার লো পেইড নিয়ে খেলায় মেতে উঠার সাহস পেতো না। তলানিতে পড়ে থাকা জেডের চেয়ে কি কারসাজি চক্রের ফুলিয়ে ফাপিয়ে তোলা ওইসব আইটেম বেশি নিরাপদ! ৫০০%-১০০০% বেড়ে যাওয়া কোম্পানি গুলো কিনতে তো নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে বাধা দেয়ার খবর পাওয়া যায় না! এতে বোঝা যায় কতিপয় হাউজ বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে নয়,নিজেদের বেশি কমিশন পাবার স্বার্থেই জেড কিনতে বাধা দেয়া হয়। কেননা জেড ম্যাচিউরড হতে ৯ কার্যদিবস সময় লাগে, এই ৯ কার্যদিবস বিনিয়োগকারীদের পুজি আটকে থাকায় ট্রেড কম হয়,ট্রেড কম হলে হাউজের কমিশনও কম আসে, অন্যদিকে অন্যান্য ক্যাটাগরি দুই কার্যদিবসে ম্যাচিউরড হয়, ফলে ঘন ঘন ট্রেড হয়, লেনদেন বেশি হয়,কমিশনও বেশি আসে। এ বিষয়টি বিবেচনায় আনলে নিরাপত্তার স্বার্থে নয় মূলত কমিশন বানিজ্যের কারণেই জেড কিনতে বিনিয়োগকারীদের বিরম্বনায় পড়তে হয়। জেড গুলো ওটিসিতে যাবে বলে এতদিন যারা পেনিক দিয়ে জেড থেকে দূরে রাখার চেস্টা করছেন এখন দুটি কোম্পানি সাসপেন্ড করার সুযোগ নিয়ে তারা ওই দুটির প্রামাণ্য চিত্র দেখিয়ে ফায়দা হাসিল করার চেস্টা করছেন। আজকে যদি জেড শেয়ার গুলোকে অন্যান্য ক্যাটাগরির মত দুদিনে ম্যাচিউরড দেয়া হয় তাহলে দেখা যাবে জেড কিনতে বিনিয়োগকারীদের কেউ আর বাধা দিচ্ছে না! কেননা তারা অন্যান্য ক্যাটাগরির মত জেড থেকেও ডে ট্রেডিংয়ের কমিশন পাবে। এদিকে জেড গুলো নিয়ে এত পেনিক আসার পরও ওইসব জেড শেয়ার গুলোতে দিন দিন ভলিউম, টার্নওভার বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি জেড গুলোকে ডিলিষ্ট ই করা হয় তাহলে এই মুহুর্তে জেড শেয়ার গুলো হাই ভলিউমে বাই করছে কারা! ডিলিষ্টের পেনিক দিয়ে কারসাজি চক্র পাবলিকের শেয়ার গুলো হাতিয়ে নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোনো কোনো খবরে দায়িত্বশীল কারো উদৃতি দিয়ে লেখা হচ্ছে যে, “জেড ক্যাটাগরিতে নাকি কারসাজি হয়!এ গুলো বাজার নষ্ট করে তাই জেড গুলোকে ডিলিষ্ট করে জঞ্জাল পরিস্কার করতে চান!” কারসাজি রোধে ডিলিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে নিজেদের দুর্বলতার পরিচয় ফুটে উঠবে, কেননা কারসাজি রোধের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার স্থাপন করা হয়েছে,তবে কি সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার কারসাজি ধরতে পারছে না! জেড গুলো ১৫ দিন দর হারিয়ে ২ দিন বৃদ্ধি হওয়া স্বাভাবিক, এই দুদিন বাড়লে যদি কারসাজি বলা হয়, তাহলে যেসব লো পেইড শেয়ার মাসের পর মাস টানা হল্টেড হয়ে ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় যায় সেটাকে কি বলা হয়! গত দুমাসে বেশ কয়েকটি শেয়ার ২০০%-৪০০% বৃদ্ধি পেয়েছে, বাস্তবতার সাথে কোম্পানি গুলোর কোনো মিল নেই।যেখানে বাস্তবতার সাথে দর বৃদ্ধির মিল নেই,কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্যও নেই সেখানেই কারসাজির গন্ধ পাওয়া যায়। ওইসব কোম্পানির কারসাজির বিরুদ্ধে তো আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি! আইপিও ছেড়ে বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা নেয়ার সময় এ গুলো ছিল খুব ভালমানের কোম্পানি! এখন ডিভিডেন্ড না দিয়ে জেড ক্যাটেগরিতে যাওয়ায় হয়ে গেছে জঞ্জাল? ডিলিষ্ট করলে কোম্পানির কি আসে যায়? বরং তারাই হাটতে বসতে জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। খোজ নিলে এমনও পাওয়া যেতে পারে যে, করপোরেট ট্যাক্স ফাকি বা ডিলিষ্টেড হওয়ার জন্য ইচ্ছা করেই অনেক কোম্পানি দীর্ঘ কয়েকবছর লোকসান দেখিয়ে ডিভিডেন্ড না দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে যাচ্ছে। তা না হলে তারা কি ব্যবসার নামে জনসেবায় বসছে যে,বছরের পর বছর লোকসান করে কোম্পানি চালাবে!
মাথা ব্যথার জন্য ঘাড় টা যেমন কেটে ফেলে দেয়া উচিত নয়, তেমনি কোম্পানির দোষে ডিলিষ্ট করে বিনিয়োগকারীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া ঠিক নয়। যতই সতর্ক করা হোক না কেন, বাজারে যে শেয়ার গুলো আছে সেগুলো কারো না কারো হাতে থাকবেই। সুতরাং বিনিয়োগের একটা অংশ ব্লক হয়ে আমাদের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শুধু তাই নয়, এমনিতেই দীর্ঘ কয়েক বছরের মন্ধায় শেয়ার বাজার নিয়ে জনমনে নেতিবাচক ধারণা জন্মেছে। এখন যদি বাজার থেকে কোম্পানি ডিলিষ্ট করার সংস্কৃতি চলতে থাকে তাহলে শেয়ার বাজারের কোম্পানি গায়েব হয়ে যায় বলে হলমার্ক বা ডেসটিনির মত শেয়ার বাজার নিয়েও জনমনে নেতিবাচক বার্তা পৌছতে পারে। তখন আস্থা সংকটে নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে আসতে ভয় পেতে পারে।এমতাবস্থায় যদি ডিলিষ্ট করতেই হয় তাহলে কোম্পানি গুলো শেয়ার ছেড়ে যে টাকা বাজার থেকে তুলেছিল, যত বছর ওই টাকা খাটিয়ে ব্যবসা করেছে তত বছরের লাভ সহ ফেরত দিতে বাধ্য করে ডিলিষ্ট করতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে সাপও মরে লাঠিও বাচে।

Rate This

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

As you found this post useful...

Follow us on social media!